এনআইডিতে থাকবে ডাক নাম, এনআইডি পেতে লাগবে বিশিষ্ট ব্যক্তির সুপারিশ

বাংলাদেশে নাগরিক পরিচয় ও সেবার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি। সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন (ইসি) জাতীয় পরিচয় পত্র…

এনআইডি করতে সুপারিশ লাগবে

বাংলাদেশে নাগরিক পরিচয় ও সেবার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি। সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন (ইসি) জাতীয় পরিচয় পত্র নিবন্ধনের ক্ষেত্রে দুটি বড় ধরনের পরিবর্তনের বিষয়ে জানায় — একটি হলো এনআইডিতে ‘ডাক নাম’ যুক্ত করা এবং অন্যটি হলো নতুন ভোটার হওয়ার ক্ষেত্রে স্থানীয় কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তির ‘সুপারিশ’ বাধ্যতামূলক করা।

নির্বাচন কমিশনের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো জালিয়াতি রোধ এবং রোহিঙ্গাদের মতো বিদেশি নাগরিকদের ভোটার তালিকায় অনুপ্রবেশ ঠেকানো।

এতে কি সাধারন নাগরিকের সুবিধা নাকি বাড়তি ভোগান্তি? আসুন এই বিষয়ে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করি।

এনআইডিতে ডাক নাম কেন প্রয়োজন?

আমাদের দেশে অফিশিয়াল নামের বাইরেও প্রতিটি মানুষের একটি পারিবারিক বা সামাজিক নাম থাকে, যাকে আমরা ‘ডাক নাম’ বলি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, একজন ব্যক্তি এলাকায় তার ডাক নামেই বেশি পরিচিত। অপরাধীরা অনেক সময় এই সুযোগটি নেয়। তারা তাদের অফিশিয়াল নাম পরিবর্তন করে বা গোপন করে নতুন এনআইডি তৈরির চেষ্টা করে।

এনআইডি উইংয়ের মহাপরিচালক এ এস এম হুমায়ুন কবীর জানিয়েছেন, ডাটাবেজে যদি ব্যক্তির ডাক নাম অন্তর্ভুক্ত থাকে, তবে তার পরিচয় যাচাই করা অনেক সহজ হবে। এটি নাগরিক শনাক্তকরণ প্রক্রিয়াকে আরও নির্ভুল এবং স্বচ্ছ করবে। এছাড়া অনেক সময় এনআইডি সংশোধনের ক্ষেত্রেও ডাক নাম না থাকার কারণে জটিলতা তৈরি হয়, যা এই পরিবর্তনের মাধ্যমে দূর হতে পারে।

এনআইডিতে বিশিষ্ট ব্যক্তির সুপারিশ কেন লাগবে?

জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন বা এনআইডি পেতে এলাকার বিশিষ্ট কোন ব্যক্তির সুপারিশ মূলত নেওয়া হয়েছে রোহিঙ্গা বা বিদেশি নাগরিকদের ভোটার হওয়া বন্ধ করতে। কারণ, স্থানীয় একজন প্রতিনিধি বা বিশিষ্ট ব্যক্তি খুব সহজেই শনাক্ত করতে পারেন যে আবেদনকারী ওই এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা কি না। এর ফলে পরিচয় গোপন করে ভোটার হওয়ার সুযোগ অনেকটাই কমে আসবে।

বর্তমানে ভোটার হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কিছু নথিপত্র প্রয়োজন হয়। তবে নতুন পরিকল্পনায় ‘নিবন্ধন ফরম-২’-তে একটি বিশেষ ঘর রাখার কথা ভাবা হচ্ছে, যেখানে এলাকার কোনো একজন সম্মানিত বা বিশিষ্ট ব্যক্তির সুপারিশ লাগবে।

সম্ভাব্য সুবিধাসমূহ

১. নিখুঁত পরিচয় শনাক্তকরণ: ডাক নাম যুক্ত করার ফলে ডাটাবেজ আরও সমৃদ্ধ হবে। এটি শুধুমাত্র অপরাধী শনাক্ত করতেই নয়, বরং সাধারণ নাগরিকদের বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজে সঠিক পরিচয় নিশ্চিতেও সহায়তা করবে।

২. জালিয়াতি ও জালিয়াতি রোধ: একজনের নামে একাধিক এনআইডি করা বা অন্যের পরিচয় ব্যবহার করার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।

৩. জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার: রোহিঙ্গাদের মতো বিদেশি নাগরিকদের ভোটার হওয়া ঠেকাতে সুপারিশের বিধানটি একটি শক্তিশালী ফিল্টার হিসেবে কাজ করবে। এটি দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক।

৪. মাঠ পর্যায়ে স্বচ্ছতা: ভোটার তালিকা হালনাগাদের সময় স্থানীয় প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ থাকায় তালিকাটি আরও নির্ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

সাধারণ নাগরিকদের সম্ভাব্য অসুবিধা

১. সুপারিশ পেতে ভোগান্তি: সাধারণ মানুষের জন্য এলাকার ‘বিশিষ্ট ব্যক্তি’র কাছ থেকে সুপারিশ সংগ্রহ করা অনেক সময় কষ্টসাধ্য হতে পারে। বিশেষ করে যারা কর্মব্যস্ত বা এলাকায় নতুন এসেছেন, তাদের জন্য এটি বাড়তি হয়রানির কারণ হতে পারে।

২. স্বজনপ্রীতি বা রাজনৈতিক প্রভাব: সুপারিশ দেওয়ার ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পছন্দ-অপছন্দ বা ব্যক্তিগত রেষারেষি প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফলে যোগ্য নাগরিকরাও সময়মতো ভোটার হতে বাধার সম্মুখীন হতে পারেন।

৩. ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা: ডাক নামের মতো আরও ব্যক্তিগত তথ্য ডাটাবেজে যুক্ত হওয়ার ফলে তথ্যের নিরাপত্তার বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠবে। হ্যাকিং বা ডাটা ফাঁসের ঝুঁকি মোকাবিলায় কমিশনকে আরও শক্তিশালী ব্যবস্থা নিতে হবে।

৪. বাস্তবায়ন জটিলতা: কোটি কোটি বিদ্যমান এনআইডি কার্ডে এই তথ্য আপডেট করা একটি বিশাল কর্মযজ্ঞ। এর জন্য পর্যাপ্ত জনবল এবং কারিগরি সক্ষমতা নিশ্চিত করা বড় একটি চ্যালেঞ্জ।

শেষ কথা

নির্বাচন কমিশনের এই পদক্ষেপগুলো আসলে কতটুকু সময়োপযোগী ও কার্যকরী তা কিছুদিন পরই বুঝা যাবে। বিষয়টি যেন সাধারণ মানুষের জন্য ‘গলার কাঁটা’ হয়ে না দাঁড়ায়, সেদিকেও নজর দেওয়া জরুরি। বিশেষ করে সুপারিশ নেওয়ার প্রক্রিয়াটি যেন সহজ এবং হয়রানিমুক্ত হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

আপনার কি মনে হয়, বিষয়টা কি ভাল হতে যাচ্ছে নাকি উল্টো নাগরিকদের ভোগান্তি বাড়াবে। অবশ্যই কমেন্টে জানান।

Similar Posts

Leave a Reply